গ্রামসীর তত্ত্ব বিচারে জিল্লুর রহমান কোন ক্যাটাগরিতে পড়েন
বুদ্ধিজীবী হিশাবে সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের অবস্থান বিশ্লেষণ ও এক সুপরামর্শ
এই নিউজলেটারে ক্রিটিক্যাল থিওরির পাঠ চলছে, যার দ্বিতীয় অধ্যায়ে আন্তোনীয় গ্রামসীর তত্ত্ব বুঝার চেষ্টা করা হয়েছে। ওইখানে একটা আইডিয়ায়, গ্রামসী বুদ্ধিজীবীদের বিভিন্ন প্রকার, বা, তাদের স্বার্থ বিশ্লেষণ করেছেন।
আজকের লেখাটি, ওই অধ্যায়ের এক সুন্দর উদাহরণ হবে, এবং আইডিয়াটি বাস্তব উদাহরণ সহকারে বুঝতে সাহায্য করবে।
কিছুক্ষণ আগে ইউটিউবে সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের এক ভিডিও দেখলাম। ভিডিওটির নামঃ “রুচির বাইরে”—তবুও বলতেই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় | স্ত্রীর মনোনয়ন নিয়ে মন্তব্য |
এই ভিডিও থেকে জানলাম, জিল্লুর রহমানের স্ত্রীর নাম ফাহমিদা রহমান। ইনি সংরক্ষিত আসনে বিএনপি থেকে সাংসদ হয়েছেন। এরপরে নাকি জিল্লুর রহমানকে নিয়ে নানা সমালোচনা হয়। ডক্টর ইউনুস সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালন করা শফিকুল আলম এই বিষয়ে নাকি আক্রমণাত্মক সমালোচনা করে পোষ্ট দিয়েছেন। পরে, সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খান শফিকুল আলমের বিষয়েও পালটা পোষ্ট দেন। সবই এই ভিডিওতে জানা গেল, কোন পোস্টই পড়া হয় নাই।
এই ভিডিওতে জিল্লুর রহমান জানান শফিকুল নিজেই বিএনপির মনোনয়ন পেতে চেয়েছিলেন। ভিডিওর মূল অবস্থান তিনটা, এক, শফিকুলের অবস্থানের অনৈতিকতা দেখানো। দুই, জিল্লুর নিজে কত সৎ, কত নিরপেক্ষ তা দেখানো। তিন, বৃহৎ নৈতিক পয়েন্ট থেকে বলা, একজন লোকের অবস্থানের জন্য তার পার্টনার কি কোন দল করতে পারবে না? তারা দুইজন পার্টনার হইলেও তো ভিন্ন ব্যক্তি, ভিন্ন ভাবে কাজ করার অধিকার তাদের আছে।
এখন ভাবেন, কেন জিল্লুররে নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে হয়, এবং এত বিশ্লেষণ করে বুঝাতে হয় তিনি আসলে নির্লোভ ও নিরপেক্ষ? এই নিরপেক্ষ অবস্থানে নিজেরে দেখাইয়া তিনি কি হাছিল করতে চান।
গ্রামসি যাদের ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবী বলছিলেন, জিল্লুর নিজেরে ঐভাবেই দেখাইতে চান। সুশীল সমাজের অংশ, নিরপেক্ষ।
এই ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবী একটা বিভ্রান্তি মাত্র। নিরপেক্ষতা দেখাইলেও তারা শ্রেণীবিহীন সত্ত্বা না। নিজেদের শ্রেণী স্বার্থই তারা রক্ষা করে।
জিল্লুর রহমানের স্ত্রীর সাংসদ হওয়া, একটা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তৈরি করেছে। তার তথাকথিত ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবীকেন্দ্রিক নিরপেক্ষতা এতে আঘাত প্রাপ্ত হয়। ফলে, আমার ধারণা, শফিকুল বা অন্য কেউ সমালোচনা না করলেও আমরা জিল্লুরের কাছ থেকে এইরকম ভিডিও দেখতাম।
আরও ভালোভাবে বললে, ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবী হয়ে থাকা জিল্লুর এখন দেখতেছেন, তারে দলীয় বুদ্ধিজীবী বলা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, আপনি তো গুপ্ত হয়ে ছিলেন। কিন্তু, "নিরপেক্ষতাই" ছিল তার ব্র্যান্ড ভ্যালু। ফলে, ভিডিও করে তিনি তার অডিয়েন্সরে বুঝাচ্ছেন, আসলে তিনি নিরপেক্ষ।
এই দ্বন্দ্বরে আমি দেখি দুই জিল্লুরের দ্বন্দ্ব হিশাবে। নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী হিশেবে নিজেরে মনে করা ও দেখানো জিল্লুর বনাম বাস্তবতার বিচারে বিএনপির ঘরে চলে যাওয়া জিল্লুর।
যদিও এটা আবার বলা বাহুল্যতা, আগেও তিনি "নিরপেক্ষ" ছিলেন না। ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবীরা নিরপেক্ষ হবার ভাণ করে, মুখোশ পরে, কিন্তু তারা নিজেদের শ্রেণী স্বার্থের পক্ষেই কথা বলেন ও কাজ করেন। নিও লিবারেল মিডিয়া-সুশীল শ্রেণীর অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল ছিলেন জিল্লুর, যতই তিনি ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবী, নিরপেক্ষতার ভাণ ধরুন না কেন।
ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবীর ইল্যুশন তৈরি করে অবস্থান করারা, যেমন ডাক্তার জাহেদ বা জিল্লুর রহমান, এনারা যে বিএনপির সাথে বিভিন্ন ভাবে যুক্ত হচ্ছেন, এটারে আমি বুদ্ধিজীবিতা তথা পাবলিক ডিস্কোর্সের জন্য ভালো মনে করি।
কারণ, সরাসরি দলের পক্ষে থাকলে, প্রথমত তার অবস্থানের সততা থাকে। দুই, আমি মনে করি এতে ব্যক্তি যে যুক্তি দিবেন বা বিশ্লেষণ হাজির করবেন, ওইটার যৌক্তিকতা ক্ষুণ্ণ হয় না। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট একটা ফ্যাক্ট, এবং যেহেতু আগেই স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে, তিনি বিএনপির কোলে চলে গেছেন, অতএব, এটা মেনে নেয়া ফ্যাক্ট হিশেবেই থাকে। তার প্রাইস হিশাবে, অনেক মানুষ তার কথা, অবস্থানরে যুক্তি ছাড়াই ডিভ্যালু ও ডিসমিস করতে চাইবে, যেটা আসলে কোন সমস্যা না, কারণ যেকোন অবস্থাতেই প্রচুর মানুষ যুক্তি ছাড়াই কোন মতরে ডিসমিস করতে চায়, গালিগালাজ করে। মনুষ্য সমাজে, বিশেষত ওপেন স্পেইসে এটা থাকবেই।
ফলে, কোন ব্যক্তি বিএনপির বা কোন নির্দিষ্ট দলের ট্যাগ লাগানো বুদ্ধিজীবী হইলেও, তিনি যৌক্তিক কথা বলতে পারতেছেন কি না, সেইটাই দেখার বিষয়।
জিল্লুর রহমান এখন তার ট্র্যাডিশনাল বুদ্ধিজীবিতার ইল্যুশন ধরে রাখতে, বিএনপির বেশী সমালোচনা করার এক অহেতুক চাপ ফিল করতে পারেন। যেটা তিনি ফিল করবেন না, যদি এই লেখাটা পড়েন, ও বুদ্ধিজীবী হিশাবে নিজের অবস্থান বুঝেন, ও বিভ্রান্তি কাটাইয়া উঠেন।


