কেলি ক্রাইটেরিয়ন কী কয়?
নীতশে, ক্লদ শ্যানন, জন কেলি -- জীবন ও জগতরে বুঝা
ধরা যাউক, আপনারে আমি ১০০ ডলার দিলাম ইনভেস্ট করতে। আপনে দুই বছর ইনভেস্ট করলেন। প্রথম বছরে রিটার্ন ৫০% পজেটিভ। পরের বছরে রিটার্ন ৫০% নেগেটিভ। এরিথমেটিক এভারেজ রিটার্ন
ওকে- টাকা তো আর লস করেন নাই।
কিন্তু, আসলে টাকা আপনে লস করছেন।
প্রথমে শুরু করছিলেন ১০০ ডলার দিয়া। প্রথম বছরে ৫০% রিটার্নে হইল, ১৫০ ডলার।
কিন্তু পরের বছরে, ১৫০ ডলারের ৫০% আপনি লস করেছেন। অর্থাৎ, আপনার এমাউন্ট দাঁড়াইল ৭৫ ডলার! যা শুরুর মূল এমাউন্ট থেকে ২৫ ডলার কম, অর্থাৎ দুই বছরের হিশাবে, আপনি বাৎসরিক ১৩.৬% হারে লস করেছেন।
এটা একটা ওয়ান্ডারফুল বুঝার মত জিনিশ। ইনভেস্টিং রিটার্নের ক্ষেত্রে এরিথমেটিক রিটার্ন তথা সিম্পল মিন একটা মিনিংলেস বিষয়।
একটা ফেয়ার কয়েন নিয়ে যদি আমরা টস করি, তাহলে বার বার করতে থাকলে এভারেজে প্রায় ৫০% হেড এবং ৫০% টেইল উঠবে। এই সিম্পল এভারেজ এখানে একটা অর্থ রাখে। কারণ এখানে আউটকাম জাস্ট দুইটা, হেড অথবা টেইল।
একইভাবে, কোন ক্লাসরুমে সকল ছাত্রছাত্রীদের প্রাপ্ত মার্ককে মোট ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা দ্বারা ভাগ করে যে সিম্পল এভারেজ পাওয়া যায়, তার দ্বারা বুঝা যায় ক্লাসের গড় মার্ক কেমন। গড় মানে ছাত্রছাত্রীরা কেমন।
এইগুলা এরগোডিক সিস্টেম।
সিস্টেম যখন নন এরগোডিক হয়, তখন সিম্পল মিন এভারেজ মানুষরে মিসলিড করে।
এ কয়েন টসের মধ্যেই যদি আরেকটা এলিমেন্ট যোগ করি, আপনি যেটাতে বাজি ধরবেন ওইটা উঠলে যা বাজি ধরছেন তার দ্বিগুণ পাবেন। কিন্তু উলটাটা উঠলে যা বাজি ধরছেন তার পুরাটা হারাবেন, তখন সিস্টেম আর এরগোডিক থাকে না।
যেমন, আমি যদি দেখি ১০০ জন খেলছে, কয়েন টস গেইম। যা বাজি ধরবে জিতলে তার দ্বিগুণ পাবে, হারলে যা বাজি ধরেছে তা হারাবে। প্রত্যেকেই ১০০ ডলার নিয়ে শুরু করলো। এই মূলধন হারিয়ে ফেললে তারা আর খেলতে পারবে না, বাস্টেড হয়ে বাদ যাবে খেলা থেকে।
আমি এটা সিমুলেট করার প্রগ্রাম বানাইছি ক্লদে, এবং একবার রিটার্ন আসলো ১২.৩%। এটা খুব ভালো রিটার্ন, কিন্তু যেহেতু সিস্টেম নন এরগডিক তাই এই এভারেজ রিটার্নের হিশাব ইন্ডিভিজুয়াল প্লেয়ার আপনার কাছে অর্থহীন ও মিস্লিডিং।
টোটাল চিত্র এরকম, ৫ জন প্লেয়ার সব হারাইছে। অনেকের রেজাল্ট আসছে মায়নাস ২০%, মায়নাস ৩০% ইত্যাদি।
আপনে এখানে সিমুলেট করে দেখতে পারেন https://claude.ai/public/artifacts/9d472eef-e634-4195-849c-9aa13d2d627b
আবার অনেক সময় দেখা যাবে, এভারেজ রিটার্ন আসছে -৬% কিন্তু কয়েকজন প্লেয়ার ২০০%, ৫০০% রিটার্ন পাইছে।
মার্ক স্পিটনাজেল তার সেইভ হ্যাভেনঃ ইনভেস্টিং ফর ফাইনানশিয়াল স্টর্মস বইতে একটা চমৎকার কথা বলেছেন, আপনে যা পান, আপনে তাই পাইছেন, যা আশা করেন তা নয়।
আপনি এই একশো জনের একজন হয়ে কয়েন টসে অংশ নিলেন, ও প্রথম টসে ৫০ ডলার বাজি ধরে যদি ৫০ ডলার হারিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনার পরবর্তী বাজি ধরাতে এর সরাসরি প্রভাব থাকবে, কারণ অলরেডি আপনার মূলধন ৫০% কমে গেছে!
যেমন, আপনি আবার ৫০ ডলার বাজি ধরলে, জাস্ট একটা মাত্র সুযোগ থাকলো, হারলে আপনে আউট।
আর, যদি আগে থেকেই ধরে নেন, অলওয়েজ যা আছে তার ৫০% দিয়ে বাজি ধরবেন, সেক্ষেত্রে যদি ৫০ এর ২৫ ডলার দিয়ে বাজি ধরেন, তাহলে, মোট একশো ডলারে যাইতে, দুইবার জিততে হবে।
২৫ বাজি ধরে দুইবার জিতলে আপনি আবার শুরুর অবস্থায় অর্থাৎ ১০০ ডলারে যাবেন।
মাল্টিপ্লিকেটিভ কম্পাউন্ডিং সবচাইতে ডেস্ট্রাক্ট্রিভ ফোর্স। ক্ষতি ও লাভ কখনোই সমান এফেক্ট রাখে না। ক্ষতির প্রভাব অনেক অনেক বেশী, কারণ ক্ষতিতে আপনার পূঁজি কমে যায়, এবং পুনরুদ্ধার করতে হয় সেই কমে যাওয়া পূঁজি থেকে।
এটা পাথ ডিপেন্ডেন্সি। আপনি শুধু একটি পথ দিয়ে হাঁটতে পারবেন, যেটি আপনার পথ। ফলে অভারল সব পথের গড় হিশাবে খেয়াল করলে আপনি তাত্ত্বিক ও বুকিশ এক বাস্তবতা পাবেন, যা বাস্তবের বাস্তবতা থেকে ভিন্ন।
যেহেতু অজস্র পথের মধ্যে আপনি একটা পথই নিতে পারবেন, এবং এর উপরেই আপনার রিটার্ন নির্ভর করবে, তাই প্রথমত বা আপনার একমাত্র কাজ হচ্ছে, বিগ লস থেকে বাঁচা। সব স্মল লস হচ্ছে গুড লস। স্মল লস নিয়ে নেয়া লজিক্যাল, কারণ, এটা থেকে ব্যাক করা ইজি। লস বাড়তে থাকলে ব্যাক করা কঠিন হবে, এবং একসময় রুইনের দিকে চলে যাবে, তখন ব্যাক করা হবে অসম্ভব।
নীতশের ইটার্নাল রিকারেন্স থট এক্সপেরিমেন্টের কথা আমি প্রায়ই বলে থাকি। যেখানে নীতশে কল্পণা করেন, এক অত্যাশ্চর্য সত্ত্বা এক গভীর রাতে আসলো আপনার কাছে, আর আপনাকে বলল, আপনার এ জীবন যেভাবে যা কিছু হইছে, সব ক্ষুদ্র বড় ঘটনা মিলে একইভাবে বার বার ঘটতে থাকবে। তখন এই প্রস্তাবে আপনি খুশি হবেন, না খুবই দুঃখিত হবেন।
যারা লাইফ নিয়া খুশি আছে, তারা খুশি হবে। কারণ অনন্ত কাল ঘটলে তো ভালোই। আবার যারা লাইফ নিয়া অখুশি আছে তারা দুঃখিত হবে, কারণ তাদের জন্য এটা নরক যন্ত্রণা।
কিন্তু শুধুমাত্র এই সহজ উপসংহারই এই থট এক্সপেরিমেন্টের মূল ইনসাইট নয়। নীতশে স্টয়িকদের আমর ফাতি আইডিয়াটি গ্রহণ করেছিলেন। এর অর্থ হলো, নিজের ফেইট তথা ভাগ্যকে ভালোবাসো।
তিনি এই থট এক্সপেরিমেন্ট দিয়ে শুধুমাত্র ব্যক্তির বর্তমান লাইফ খুশি না অখুশি এটা বুঝা দিয়েই শেষ হন নি, বরং আমরা যদি তার আমর ফাতি আইডিয়ার সাথে মিলাই, তাহলে বুঝব, তিনি বলতে চাইছেন, অসংখ্য পথ থাকতে। দুনিয়ার ৮ বিলিয়ন লোকের ৮ বিলিয়ন পথ। এবং প্রতিটা ব্যক্তিরও সম্ভাব্য অনেক পথ। কিন্তু, ওইগুলা অর্থহীন, কারণ ওই পথগুলাতে এই ব্যক্তি যান নাই। যাইতে পারবেন না। তার কাছে কেবল ও কেবলমাত্র আছে, তারই পথ, যেটাতে তিনি এখন আছেন। তার উচিৎ এইটারে ভালোবাসা, আমর ফাতি। এইটারেই টেইক কেয়ার করা।
একজন ট্রেডারের ক্ষেত্রে, তার প্রথম উদ্দেশ্য থাকবে তার লস কমানো, কারণ লসরে বাড়তে দিলে, বিশেষত ৩০% এর উপরে চলে গেলে, সে তার পাথরেই হুমকির মুখে ফেলে দিল।
এর জন্য প্রতিটা বেটে সে কী পরিমাণ বাজি ধরবে, অর্থাৎ পজিশন সাইজিং গুরুত্বপূর্ণ। সে যদি খুব কম বেট ধরে, তাহলে রিটার্ন খুব কম হবে। সে তার ক্যাপিটালের অপটিমাম ইউজ করতে পারল না। আবার যদি বেশী বাজি ধরে, তাহলে নিজেকে রুইনের মুখে ফেলে দিল।
জন কেলি, ক্লদ শ্যানন এবং এক অসাধারণ ইনসাইট
১৯৫৬ সালে নিউ জার্সির মারে হিলে অবস্থিত বেল ল্যাবের একটি ছোট অফিসে বসে জন ল্যারি কেলি জুনিয়র একটি অদ্ভুত সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন। এই পদার্থবিদের সামনে ছিল ক্লদ শ্যাননের ইনফরমেশন থিওরির একটি জটিল প্রশ্ন। শ্যানন, যিনি ডিজিটাল যুগের জনক হিসেবে পরিচিত, তখন বেল ল্যাবে কেলির সহকর্মী ছিলেন।
যদি একটি নয়েজি কম্যুনিকেশন চ্যানেল এর মাধ্যমে আপনার কাছে অসম্পূর্ণ তথ্য আসে, তাহলে সেই তথ্য ব্যবহার করে কীভাবে সর্বোচ্চ লাভজনক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? তৎকালীন আমেরিকায় কিছু চতুর মানুষ টেলিগ্রাফ উইয়ার ট্র্যাপ করে ঘোড় দৌড়ের ফলাফল আগে জেনে নিত। কিন্তু এই টেলিগ্রাফ সিগনালে অনেক নয়েজ থাকত, তথ্য ১০০% নির্ভুল ছিল না। এই অস্পষ্ট তথ্যের উপর নির্ভর করে কত টাকা বাজি ধরা যুক্তিসঙ্গত? - এটাই ছিল সমস্যা।
কেলি বুঝতে পারলেন এটা আসলে ইনফরমেশন ট্রান্সমিশনের সমস্যা। তথ্যের উৎস থেকে শুরু করে নয়েজি চ্যানেল হয়ে বেটিং সিদ্ধান্ত পর্যন্ত - পুরো প্রক্রিয়াটি একটি ম্যাথম্যাটিক্যাল ফ্রেমওয়ার্কে বিশ্লেষণ করা গেলে এই সমস্যা দূর করা যায়। তিনি দেখালেন যে ওয়েলথ গ্রোথ রেইট এবং তথ্যের রেইট একই গাণিতিক নীতি অনুসরণ করে।
তার মূল ইনসাইট ছিল, দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ বৃদ্ধির জন্য এরিদমেটিক মিন নয়, বরং জিওমেট্রিক মিন করতে হবে। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নিল বিখ্যাত কেলি ক্রাইটেরিয়ন,
f* = (bp - q) / b
এখানে f* হলো আপনার ব্যাংকরোলের সর্বোচ্চ কত অংশ বেট ধরবেন, b হলো odds, p হলো জয়ের সম্ভাবনা, এবং q হলো হারার সম্ভাবনা।
উদাহরণ, ধরা যাক, আমি নিউজ, টেকনিক্যাল সিগনাল ব্যবহার করে, নিজস্ব বিচার বুদ্ধির দ্বারা অনুমানে পৌছালাম কোন স্টকের দাম দ্বিগুণ বাড়বে, এর সম্ভাব্যতা ৬০%। আমার মূলধন ১০০০ ডলার। স্বেক্ষেত্রে কেলি ক্রাইটেরিয়নের হিশাবে কত অংশ আমি এখানে ইনভেস্ট করব?
পুঁজি: ১০০০ ডলার
জয়ের সম্ভাবনা (p): ০.৬০ (৬০%)
হারার সম্ভাবনা (q): ১ - ০.৬০ = ০.৪০ (৪০%)
প্রতিফল বা অডস (b): দ্বিগুণ লাভ মানে 2:1 odds, অর্থাৎ b = 2
f* = (2 × 0.60 - 0.40) / 2= (1.20 - 0.40) / 2
= 0.80 / 2
= 0.40
অর্থাৎ, কেলি ক্রাইটেরিয়ন অনুযায়ী এখানে ৪০% অর্থাৎ ৪০০ ডলার বাজি ধরা অপটিমাল।
বাস্তব জীবনে, এখন যেহেতু নয়েজের পরিমাণ অনেক বেশী, তাই সেইফ সাইডে থাকতে ফুল কেলি ব্যবহার না করে ফ্র্যাকশনাল কেলি ব্যবহার করা হয়। যেখানে ফুল কেলিতে ৪০% আসলে, আপনি এর অর্ধেক ইনভেস্ট করবেন। এটাকে বলে হাফ কেলি। আরো কম করলে, কোয়ার্টার কেলি।
এটা কীভাবে কাজ করে তা দেখাতে আমি এই ওয়েব এপ বানিয়েছি।
Kelly Criterion Portfolio Calculator
এখানে আপনি উইন রেইট অর্থাৎ, আপনার এনালাইসিস মতে এই ট্রেডে জেতার সম্ভাব্যতা দিবেন।
অডস বা উইন/ লস রেশিও দিবেন। এই উদাহরণে ১:৫। প্রতি এক ডলার ইনভেস্টমেন্টে, জিতলে ১.৫ ডলার করে পাওয়া যাবে। মোট হবে ২.৫ ডলার। আর হারলে জিরো।
মূল ক্যাপিটাল ১০০০।
সেইফ হ্যাভেন ইনভেস্টমেন্ট, এটা এখানে ব্যাখ্যা করতে পারব না। অন্য আরেক বিষয়ে চলে যাবে। ধরে নেন, এক্সট্রিম ডাউনসাইড এড়াতে একটা প্রিমিয়াম বা ফি হিশেবে। এটা জিরোও রাখতে পারেন এখন।
কাস্টম এলোকেশন হইল, কেলি ক্রাইটেরিয়ন হিশাব ছাড়া, আপনি নিজ থেকে অনুমানের ভিত্তিতে যে পরিমাণ বেট ধরতে চাইবেন।
নাম্বার অব ট্রেডস হচ্ছে, কতবার র্যান্ডম সিমুলেশন করে দেখতে চান। ১০০ দিতে পারেন।
এই ইনপুটগুলা দিলে, এই টুল আপনারে প্রতিটা কেলি ফ্র্যাকশন, এবং আপনার কাস্টম এলোকেশনের মিন রিটার্ন দেখাবে, রুইনের সম্ভাবনা দেখাবে।
একজন ট্রেডারের মূল কাজ, রুইনের সম্ভাব্যতা কমানো, ও রিটার্নের সম্ভাব্যতা ম্যাক্সিমাইজ করা। আশা করি এই লেখাটি আপনাকে রিস্ক নিয়ে ভিন্ন ভাবে ভাবতে শেখাবে।









খুব কঠিন একটা লেখা। বুঝিনি। বারবার পড়ে বুঝতে হবে।